নতুনত্বের নেশা থেকে নিস্পৃহতার শূন্যতায় (৩য় অংশ)

 লেখক হাবীব আহমেদ এর কলাম 🙁 চলমান পাতা-০৩)

কেরালার শান্ত নদীকূল, সিংহলীদের হাসি, আফগানদের চোখের গভীর বিষাদ, আসাম ও সিলেটের চা-বাগানের শ্রমিকদের ঘামে মিশে থাকা জীবনসংগ্রাম—সবকিছুই আমায় মানুষকে নতুন করে চিনিয়েছে।
আমার জীবনের আরেকটি বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা ছিল পৃথিবীর অত্যন্ত ধনী ও ক্ষমতাবান এক বিদেশী রাজপরিবারের খুব কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পাওয়া। তাদের সঙ্গে কিছুটা বন্ধুত্বও হয়েছিল। তাদের জীবন ছিল প্রাচুর্যে পূর্ণ—অট্টালিকা, বিলাসিতা, নিরাপত্তা, ক্ষমতা, যা সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতে পারে না। আবার অন্যদিকে, আমি এমন মানুষদের সঙ্গেও বসেছি, যাদের সারা দিনের উপার্জন দিয়ে সন্ধ্যার খাবার জোটে কি না, তারও নিশ্চয়তা ছিল না।
একদিকে ছিল সোনার চামচে পরিবেশিত ভোজ, অন্যদিকে ছিল শুকনো রুটি ভাগাভাগি করে খাওয়া। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সুখের সংজ্ঞা আমি দুই জায়গাতেই আলাদা আলাদাভাবে দেখেছি। ধনী মানুষের প্রাসাদে যেমন নিঃসঙ্গতা দেখেছি, তেমনি গরিব মানুষের কুঁড়েঘরেও দেখেছি অদ্ভুত প্রশান্তি। তখন বুঝেছি—সম্পদ মানুষের জীবনকে আরাম দিতে পারে, কিন্তু শান্তি কিনে দিতে পারে না।
শুধু মানুষ নয়, প্রকৃতিও ছিল আমার শিক্ষক। নদী আমাকে শিখিয়েছে—স্থির হয়ে থাকা মানে থেমে যাওয়া। প্রবাহিত হতে হয়, বাধা এলে পথ বদলাতে হয়, কিন্তু চলা বন্ধ করা যায় না। সমুদ্র আমাকে শিখিয়েছে—গভীরতা কখনো শব্দ করে না। মরুভূমি আমাকে শিখিয়েছে—অভাবের মধ্যেও বেঁচে থাকা সম্ভব। পাহাড় আমাকে শিখিয়েছে—যত উপরে ওঠা যায়, তত বিনয়ী হওয়া প্রয়োজন।
আমি মুসলমান, ইসলাম আমার ধর্ম। নিজের ধর্মকে ভালোবেসেই আমি অন্য ধর্মের মানুষদের কাছেও গিয়েছি। মন্দিরে বসেছি, গির্জায় বসেছি, প্যাগোডায় বসেছি, গুরুদুয়ারায় বসেছি। মানুষের প্রার্থনা দেখেছি, তাদের বিশ্বাসের সৌন্দর্য দেখেছি। কখনো কখনো মনে হয়েছিল, এত পথ, এত বিশ্বাস, এত রীতি—মানুষ কি তবে বিভ্রান্ত হয়ে যায় না? পরে বুঝেছি, সত্যিকারের বিশ্বাস মানুষকে বিভক্ত করে না; বরং মানুষকে আরও মানবিক করে। মানুষের ভাষা আলাদা হতে পারে, পোশাক আলাদা হতে পারে, প্রার্থনার ভঙ্গি আলাদা হতে পারে; কিন্তু ভালোবাসা, সত্য, দয়া আর মমতার ভাষা পৃথিবীর সবখানেই এক।
আমি মানুষের মহত্ত্ব দেখেছি। আমি মানুষের নীচতাও দেখেছি। আমি দেখেছি একজন অচেনা মানুষ তার শেষ খাবারটুকু পথিকের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছে। আবার দেখেছি, মানুষ কখনো কখনো নিজের স্বার্থের জন্য আপনজনকেও কষ্ট দিতে দ্বিধা করে না। তখন আমার মনে হয়েছে—মানুষ আসলে নদীর মতো। নদীর যেমন স্বচ্ছ অংশ আছে, তেমনি আছে কাদামাখা অংশও। মানুষের ভেতরেও ভালো-মন্দ পাশাপাশি বাস করে। প্রতিটি মানুষই এক একটি যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে প্রতিনিয়ত আলো আর অন্ধকারের লড়াই চলে। (চলমান…৪)
-হাবীব, 21.07.26

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *