সম্পাদকীয়
একটি দেশ ও জাতি তখনই উন্নয়নের চূড়ান্ত ধাপে উন্নীত হয় যখন চিন্তা-ভাবনা,কৃষ্টি-কালচার ও সভ্যতা এক হয়।
আমরা রাষ্ট্র বিজ্ঞান অধ্যয়ন করলেও তা হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম নই। রাষ্ট্র বিজ্ঞানে তুলে ধরা হয় নানা পেশা ও বিশ্বাসীদের নাগরিক ভাবনা। যার ফলোশ্রুতিতে এ বিজ্ঞান অধ্যয়নে নানা ভিন্নতার যোগসূত্র স্থাপন ও উন্নয়নের চুড়ান্ত সোপানে একটি একক আদর্শের মাপকাঠি দিয়ে থাকে। যাকে বলে রাষ্ট্রীয় আদর্শ। কোন বিশ্বাসীর কী রুচিবোধ ও কোন পেশার কী দক্ষতা তা জেনে সেই আলোকে গড়ে ওঠে একটি স্বাধীন রাষ্টের সংবিধান। বেশিরভাগ পার্লামেন্টারিয়ান সদস্যের মতামত নিয়েই গঠিত হয় একটি রাষ্ট্রের ঐক্যের কাঠামো। কিন্তু আমরা কী আজ জাতিকে ঐক্যসূত্রে আনার এমন ফরমূলা দিতে পেরেছি? পৌর বিজ্ঞানের যাবতীয় কলার অনুসৃত বিষয়ের প্রতিপলন ঘটাতে কতই না শিল্পকলার পতন ঘটিয়েছি। আমাদের রাজনীতি,সমাজনীতি ও ধর্মীয় আচার অনুভুতির বিভাজনকে সাংঘর্ষিক আবেগে কাজে লাগিয়ে রক্তপাত ঘটাতে সক্ষম হয়েছি। যে নেতৃত্ব আমাদেরকে ঐক্যে এনে দাঁড় করাতে পারে সেই ব্যক্তিত্বকেও করেছি প্রশ্নবিদ্ধ ! বেশির ভাগ বিশ্বাসী জনগোষ্ঠীর মূলমন্ত্রকে ধর্মীয় কাজে ব্যবহার না করে করছি নিজস্ব দল ও মতের কর্মে। যেমন মুসলমানের যে কলেমা একটি বিশ্বাসের মূলমন্ত্র তা ব্যবহৃত হচ্ছে রাজনৈতিক প্রতীকের শ্লোগানে, তা ব্যবহৃত হচ্ছে ভিক্ষাবৃত্তিতে অনুগ্রহ সৃষ্টির কৌশলে। যে ভরসায় ইনশাল্লাহ ব্যবহৃত হবার কথা তা ব্যবহার করছি ধর্মীয় আচার-আচরণ বহির্ভূত অধর্মীয় জায়গায়। ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞায় যা নিষিদ্ধ। ফলে ধর্মনিরপেক্ষতাকেও আমরা প্রশ্নবিদ্ধ করছি। যারা সঠিকভাবে ধর্মানুভুতি সম্পন্ন তারাও ক্রমশঃ হয়ে ওঠছি প্রতিক্রিয়াশীল বা রক্ষনশীল হিসেবে। কারণ এক ধর্মের বাহক অন্য ধর্মের বাহকের প্রতি অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছি। “সমাজ যাকে দিচ্ছে থু থু তারা তো নয় ঘৃণার ” এমন এক লেখকের অনুসন্ধান পাওয়া গেছিল আশি দশকে। তাহলে এ সমাজ নিয়েও কিছু লিখতে হয়। সমাজ কাকে বলে বা এর সংজ্ঞা কী তা সমাজবিজ্ঞানে থাকলেও রাষ্ট্রের প্রয়োজনে রাষ্ট্র বিজ্ঞানেও আছে। কারণ এ সমাজই তো রাষ্টের অনুসৃত নীতি অনুসরণ করে থাকে। এ সমাজ যখন উঁচু-নিচু ভেদাভেদ সৃষ্টি করে তখন রাষ্ট্রীয় গঠনতন্র ও সংবিধান অকার্যকর হয়ে ওঠে। আজকের সমাজ অন্যকে নিয়ে যেমন ট্রল করে অর্থাৎ উঁচু শ্রেণি যে কারণে নিচু শ্রেণির লোককে অবজ্ঞা ও অবহেলা করে, ঠিক একই কারণে উঁচু শ্রেণিরা একই কাজে নিজের বেলায় তা আভিজাত্যের বিষয় বলে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়। সমাজবিভক্তির এরূপ চিত্র আজ প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাজ নামীয় গোষ্ঠীবদ্ধ শ্রেণিটায় দলে দলে বিভাজন প্রক্রিয়ায় তৎপর। তাহলে বুঝা গেল ধর্মের ও সমাজের বিভাজন প্রক্রিয়ার কথা। আসি রাজনীতি বিভাজন নিয়ে। রাষ্ট্র কোন নীতিতে কীভাবে চলবে তা নির্ধারিত হয় বেশিরভাগ মতাদর্শের ভাবনায়। বিশেষ করে সাধারণ মানুষ এর ম্যান্ডেট দিয়ে । জনগণ যখন নানা মতে বিভাজিত হয় তখন এর প্রভাব পড়ে রাজনীতিতে। কারণ বিভাজিত জনগণ হতেই তৈরি হয় নানামতের নেতা ও নানা আদর্শের রাজনীতি। রাষ্ট্রের ভিত মজবুতির স্থলে যখন রাজনৈতিক অনৈক্য বাসা বাঁধে তখন রাজনীতিতে রাজনীতিতে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা। রাষ্ট্রীয় পরিচালনায় তখন সুষ্ঠু পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। দমননীতির কৌশল চলে অবলীলায়। শক্তির উৎস হিসেবে কেউ রাষ্ট্র যন্ত্রকে ব্যবহার করে। কেউবা চোরাপথে প্রতিপক্ষের জবাবে ধ্বংসাত্মক নীতি অবলম্বন করে থাকে। এরই মাঝে দালাল শ্রেণির মতো একদল সুবিধাবাদী তেলবাজ নেতৃত্ব তৈরি হয়। তেলবাজ সুবিধাবাদীরা কোনো এক সময় রাষ্ট্রের গুরত্বপূর্ণ স্থান দখল করে বসে। তারাই পরে অপেক্ষাকৃত দূর্বল রাজনীতির নেতৃত্বকে নাস্তেনাবুদ করে রাখে। এমনকী নিজদলেও কোন্দল তৈরি করে আমরণ ফায়দা লুটার কাজে নিয়োজিত থাকে। ফলে রাজনীতি হয় অপরাজনীতি তথা অপশক্তির নিয়ামক। রাজনীতিতে রাজনীতিতে চলে প্রতিহিংসা,প্রতিশোধ ও প্রতিরোধ খেলা। শেষে তা রূপ নেয় সংঘর্ষের। যার জন্য রাষ্টের কোনো সমন্বিত রূপরেখা প্রণয়ন করা সম্ভব হচ্ছেনা। ফলে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে দেশের উন্নয়ন প্রকল্প। এরই মাঝে ৭১সালের পরাজিত অংশটিও শক্তিশালী রাজনৈতিক দলে পুনর্বাসিত। তারাও ধ্বংসাত্মক কর্মে লিপ্ত। এভাবে মতাদর্শের ভিন্নতায় জাতীয় উন্নয়ন আজ মারাত্মকভাবে ব্যহত। রাজনৈতিক অঙ্গনে ত্যাগী মনোভাব তৈরি না হলে অদৃশ্য অশুভ শক্তিই কেবল রাজনীতিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। এখন তা-ই হচ্ছে। আমরা বলে থাকি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা। ৭১ সালের পর সেই চেতনা এখন মৃত। মুক্তিযোদ্ধারা এখন আর খুনি রাজাকারদের বিচারে তৎপর নেই। যারা এ বিষয়ে তৎপর তাদের পাশেও মুক্তিযোদ্ধারা সক্রিয় নেই। এখনও দেখা যায় যারা রাজাকারদের শাস্তির প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী দিয়েছে তারা অনিরাপদে আছে। কেহবা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। বর্তমান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ক্ষমতায় থাকতে সাক্ষীরা কেন ভারতে আশ্রয় নেবে? প্রতিটি অঞ্চলে কেন তারা প্রশাসনের আজানা অবস্থায় বসবাস করবে? আজ ক্ষমতাসীন রাজনীতির অনেক নেতারাই যুদ্ধাপরাধী মামলার সাক্ষীদেরকে চেনেনা। অথচ তারাও ৭১’র খুনিদের বিষয়ে সাক্ষী দিয়ে দুঃসাহসিক যুদ্ধ করেছে। তারা সাক্ষীযোদ্ধা। কিন্তু তারা আজ অবহেলিত,অবমূল্যায়িত। ফলে এ কষ্টগুলোও জাতীয় বিভাজনে কাজে লাগছে। তাই আমাদেরকে জাতীয় সাফল্যে পৌঁছতে হলে উপরোল্লেখিত বিষয়গুলো ভাবতে হবে। একটি সমন্বিত ঐক্যই পারে একটি জাতিকে উন্নতির শীর্ষে আরেহণ করাতে। আজ আমাদের উচিত, একটি রাষ্টের বিভাজনে যতগুলো দিক আছে, যে সব ক্ষেত্র আছে তার সবকটিতে গবেষণা করে সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করা। সময় এসেছে এ বিষয়ে ভাবার, এ বিষয়ে মহাঐক্যের। ঐক্যবদ্ধ হোক এদেশের জনগণ। গঠিত হোক ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ।











Leave a Reply